শুক্রবার, ৮ নভেম্বর, ২০২৪

চিঠি।

পশ্চিম শেওড়াপাড়া মিরপুর, ঢাকা ১২১৬ 
০৪ আগস্ট ২০২১ 
রাত 

শ্রদ্ধেয় বন্ধুসুলভ প্রিয় ইব্রাহিম ভাই একটা চিঠি দিলাম ব্যথার জলে। আমার জীবনের সবচেয়ে খারাপ সময়ের লেখাটি আপনার কাছে লিখে গেলাম। 
ছোট থেকে মানুষ হয়েছি জীবনের সাথে সংগ্রাম করে। কোনোদিনও নিজের চাওয়া পাওয়ার উপর দাবি বসাইনি। 
জীবনে ভোগ বিলাসিতার চেয়ে ত্যাগ করার চেষ্টাটাই অধিক করেছি। জীবনে কখনো কারো ক্ষতি চাইনি, কারো দুটাকা মেরে খাইনি, 
কেউ বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবে না আমার জন্য কারো ক্ষতি হয়েছে, যদি কেউ বলে তাহলে বুঝে নিয়েন সে তার স্বার্থ হাসিলের জন্য মিথ্যে রটনা করেছে। 
আমার এই লেখা কোনো অভিযোগ বা কারো বিরুদ্ধে নালিশ নয়, এই লেখা আমার জীবনের সবচেয়ে খারাপ সময়ে ঘটে যাওয়ার করুণ দিনগুলি। 
পড়ালেখা করার সুযোগ পাইনি তেমন, ছোটবেলা খুব ইচ্ছে ছিল বড় হয়ে সেনাবাহিনী হব, ভাগ্যের লিখুন আজ আমায় কোথায় নিয়ে এসেছে, 
এই সমাজ আমাকে কবি বলে ডাকে আজ। বিশ্বাস করুন আমি কোনোদিনও কবি হতে চাইনি, চেয়েছিলাম মানুষের উপকার করতে, মানুষের দুঃখে পাশে থাকতে। 
জীবন আমায় অনেক কিছু দিয়েছে, জীবনের চাওয়া পাওয়ার হিসেব একদমই নেই। আমার বাবা, মা, ভাই, বোন, ছোট্ট ভাগ্নি এরা সবাই 
আদর স্নেহ ভালোবাসা দিয়ে সবসময় আমাকে ভালো রেখেছে, এদের ঋণ এই জন্মের পর পরের জন্মেও শোধ হবে কিনা সন্দেহ আছে। 
প্রিয় ভাই, অর্থ বা খাওয়ার অভাব আমার নেই, আল্লাহ যা দিয়েছে তা দিয়ে ডাল ভাত খেয়ে সুন্দরভাবে জীবন চলে যায়। আমার বড্ড অভাব প্রিয় একজন মানুষের। 
যে আমাকে বুঝবে, আমার মন খারাপ দূর করবে, সুখদুঃখের ভাগীদার হবে, আমার দোষ গুণ গুলোকে ভালোবাসবে। 
আমার জীবনে প্রেম এসেছে কিন্তু প্রিয় মানুষ আসেনি। স্কুলে পড়তে কাজলী নামের একটি মেয়ে আমাকে ভালোবেসেছিল, 
আমার যখন চাকরি জীবন শুরু হয় তখন ফাতেমা নামের একটি মেয়ে আমাকে ভালোবেসেছিল, 
এরা দুজনেই নিজ হতে এসে তাদের প্রয়োজন শেষে আমার জীবন থেকে চলেও গেছে। কাজলীর খোঁজ খবর জানি না, 
ফাতেমার সুখের সংসার তার কোলজুড়ে ফুটফুটে একটি পুত্র সন্তান। তানিয়ার কথা তো সবই জানেন 
নতুন করে লিখে আর কি জানাবো আপনাকে, তবু কিছু কথা লিখা থাক এই চিঠিতে। 
তানিয়াকে প্রথম দেখেছিলাম বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে, এরপর অমর একুশে বইমেলায়, সেখানে তার সাথে পরিচয় হয় কথা হয় ফেসবুকে বন্ধুত্ব হয়। 
আমার পছন্দের রং সাদা কালো কেনো জানেন? কারণ এই রং ছাড়া আমার জীবনে আর কোনো রং আমাকে গ্রহণ করেনি, 
যারাই করেছে প্রয়োজন শেষে বাসি ফুলের মতো ময়লার ডাস্টবিনে ছুড়ে ফেলেছে। কোনোদিনও নিজের থেকে কোনো মেয়েকে বলা হয়নি ভালোবাসি, 
এই প্রথম সাহস করে একটি মেয়েকে বলেছি ‘আমি আপনাকে ভালোবাসি।’ তানিয়া উত্তর দিয়ে বলল ‘ভালোবাসাগুলো বাঁচিয়ে রাখবেন।’ 
এরপর সে তার ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম ও মোবাইল নম্বরে আমাকে ব্লক লিস্টে রাখলেন। তার সাথে যোগাযোগ করার আর সুযোগ পাইনি। 
তার এমন অদ্ভুত আচরণে আমি পাগলের মতো হাসতে ছিলাম আর ভাবতে ছিলাম আমি একটা পাগল। 
মানুষ তখনই একজন মানুষকে ভালোবাসে যখন সে তার যোগ্য হয়। প্রিয় ভাই, হাসতে আর ভাবতে ভাবতে চলতে থাকে আমার জীবন। 
২০১৮ তে আমার কর্মজীবনের কঠিন একসময় আসে, চাকরি নেই চাকরি খুঁজে পাচ্ছি না, কোথায় যাই কার কাছে চাকরির কথা বলব, কে দেবে চাকরি। 
পরিচিত যত মুখ ছিল কমবেশি সবার দুয়ারে গিয়েছি চাকরির খোঁজে, কিন্তু প্রয়োজন শেষে সবাই বলেছে এবার তুমি আসতে পারো, কেউ আর চাকরি দিলো না। 
একদিন এক প্রযোজকের সাথে নিজের খারাপ সময় শেয়ার করলাম, তার সাথে আগে থেকেই পরিচয় ছিল। 
সে বলল দেখা করতে, তার সাথে দেখা করতে ছুটে গেলাম চাকরির খোঁজে, হয়ত তিনি একটা ব্যবস্থা করে দেবেন আমার। 
পকেটে ২০টাকা নিয়ে কারওয়ান বাজারের সামনে নেমে বাস ভাড়া ১০টাকা দিয়ে পকেটে রইলো মাত্র ১০টাকা। 
তার সাথে মোবাইলে যোগাযোগ করে জানতে পারি সে এটিএন বাংলায় আছে। আমাকে বলল আরটিভি ভবনের পিছে বেশকিছু চায়ের দোকান আছে সেখানে গিয়ে বসতে। 
গলিতে ঢুকে দেখি টেলিভিশনের পর্দায় দেখা বেশকিছু গুণী মানুষেরা এখানে দাঁড়িয়ে সিগারেট চা খাচ্ছে আর আড্ডা দিচ্ছে। 
পকেটে টাকা নেই তাই সাহস করে কোনো দোকানে গিয়ে বসলাম না, দাঁড়িয়ে আছি প্রযোজকের অপেক্ষায়। 
ভিক্ষুক ভিক্ষার জন্য যেভাবে মানুষের দুয়ারে দাঁড়ায় সেদিন আমার মনে হয়েছিল আমিও তাদের আত্মীয় হয়ে এসেছি নিজের কর্ম ভিক্ষা পেতে। 
দাঁড়িয়ে থেকে ২ঘন্টা চলে গেলো তার আসার খবর নেই, মোবাইলটি বার-বার হাতে নিয়েও ফোন করি না ভয়ে, যদি সে কিছু মনে করে। 
অবশেষে তার হাসিমাখা মুখটাকে দেখলাম, ‘কষ্ট হয়েছে তোমার তাই না, চলো এখন।’ 
সে হাঁটে তার পিছে পিছে আমি হাঁটি, এভাবে হেঁটে কারওয়ান বাজারের কোন এক গলিতে নিয়ে গেলো, সেখানে গিয়ে দেখি কম্পিউটারের একটি দোকান, 
কি জানি টাইপিং করালো সে, প্রিন্ট শেষে কাগজটি হাতে নিয়ে এবার আবার সে হাঁটে তার পিছে পিছে আমি হাঁটি। 
এটিএন বাংলায় দুজনে প্রবেশ করলাম, আমাকে রিসিপশনে রেখে প্রযোজক এটিএন বাংলার চেয়ারম্যানের সাথে সাক্ষাৎ করে তার নাটকের কাজ সেরে 
এবার নিয়ে আসলো মগবাজারের এক বাড়িতে, সেখানে এসে দেখি ভিডিও এডিটিং রুম, দেশের সিনেমা টিনেমা নাটক গান এখানে কাটছাট করা হয়। 
রাতের দশটায় বাসা থেকে বাবার ফোন কোথায় বাসায় আসো। প্রযোজক স্যারকে বললাম স্যার এখন বাসায় যেতে হবে, বাসা থেকে ফোন এসেছে। 
তার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে পেটের খুদা পেটে লয়ে মগবাজার থেকে হেঁটে হেঁটে কারওয়ান বাজারের ট্রাফিক সিগনালের সামনে আসি। 
১০টাকা বাস ভাড়া দিয়ে আগারগাঁও তালতলায়। বাসায় এসে খাওয়া দাওয়া করে ঘুম। 
সেদিন প্রযোজক নিজের স্বার্থ হাসিলের পর আমাকে চাকরির উপহার স্বরূপ কিছু জ্ঞান দিয়েছিল চাকরি নয়। 
মানুষের কাছ থেকে বিনা পয়সায় জ্ঞান পাওয়া যায়, এটার জন্য কোনো মানুষ আপনাকে বলবে না আমাকে টাকা দাও জ্ঞান দিয়েছি তাই, 
কিন্তু চাকরি চান, বলবে টাকা আছে? জীবন আমাকে অনেকিছু শিখিয়েছে, এই জন্য জীবনদাতাকে খুব ভক্তি করি। 
প্রিয় ভাই, কোথাও যখন চাকরি পাচ্ছিলাম না, তখন বাধ্য হয়ে নিজের পরিবারে থাকা বাবা, মা, ভাই, বোনদের মুখের দিক তাকিয়ে একটি কলেজে চাকরি নিই, 
চাকরিটা ছিল এমন যে কলেজ যতক্ষণ চলবে তুমি গেইট দেখাশোনা করবে এরপর তোমার ছুটি। সকাল ৭টায় গিয়ে কলেজ খুলতাম আর ৩টায় বন্ধ করে বাসায় চলে আসতাম। 
একদিকে সংসার আরেকদিকে সাহিত্য সাধনা সবমিলিয়ে আমার জীবন ‘কেমন জানি লাগে।’ ২০১৮ বা ১৯ এ কলেজের চাকরিটা নিই, এরমধ্যে আরও কত ঘটনা জীবনে ঘটে গেলো, 
একটি চাকরি চাই, আমাকে একটি চাকরি দেবেন, সবাই দিয়েছে চাকরির উপহার স্বরূপ জ্ঞান। 
২০১৯ এ যখন তানিয়ার অবহেলায় আমি ব্যথিত তখন কলেজের একটি মেয়েকে পছন্দ হয়, নাম তার নূরজাহান। 
সে তার জীবনের অনেক কথাই আমার সাথে শেয়ার করেছে, তার আচরণ খুবই মিষ্টি নম্র ভদ্র। 
২০১৯ থেকে ৪আগস্ট ২০২১ বুধবার দুপুর ২টা ৩১মিনিটের আগ পর্যন্ত তার কাছে আমি একজন ভালো মানুষ হিসেবেই ছিলাম। 
আজ যখন তাকে বললাম ‘আপনাকে দেখে যাচ্ছি বছর দুই এক ধরে, আমি আপনাকে ভালোবাসি।’ 
সে উত্তর দিয়ে বলল ‘আমি আপনার থেকে এমন কিছু কখনও আশা করিনি যাক সেসব কথা। আমি দুঃখিত আমার বিয়ে ঠিক হয়েছে আরো অনেকদিন আগে আমার কাজিনের সাথে।’ 
প্রিয় ভাই, এই হচ্ছে আমার জীবন। তানিয়ার অবহেলা ভুলতে নূরজাহানকে বলেছিলাম ‘ভালোবাসি।’ অথচ সে আমাকে ভুল বুঝলো। 
তার কাছে ক্ষমা চেয়েছি সাথে সাথে, বলেছি ‘যদি পারেন ক্ষমা করে দিয়েন আমাকে।’ 
প্রিয় ভাই, প্রিয় মানুষকে হারানোর যন্ত্রণার চেয়ে দ্বিতীয় কোনো যন্ত্রণা পৃথিবীতে নেই। আমার নামের পাশে অধম দেখে আপনি একদিন বলেছিলেন নিজেকে ওত তুচ্ছ ভাবতে নেই, 
ভাই নিজেকে কখনো তুচ্ছ ভাবিনা। আমিত্ব আমাকে যেনো গ্রাস করতে না পারে সেজন্য নিজেকে সবসময় অধম বলে গন্য করি। 
আমার খাওয়ার অভাব নেই, এখন একটি চাকরি আছে, বেতন যা পাই তা দিয়ে ডাল ভাত খেয়ে সুন্দরভাবে দিন চলে যা, কারো কাছে যেতে হয় না। 
জীবনের খারাপ সময় মানুষের চিরদিন থাকে না, সুসময় মানুষের জীবনে আসে। তবে একটা কথা কি এই মনে যাকে ধরে সে মানুষটি যদি একবার হারিয়ে যায় আর ফিরে আসে না। 
আমি জীবনে যাকেই আপন করতে চেয়েছি সেই আমাকে ভুল বুঝেছে। আমি সবার জন্যই প্রার্থনা করি, সবাই ভালো থাকুক, সুখে থাকুক, সবার জীবনে সুখ আসুক, কেউ যেনো না কাঁদে। 
নূরজাহান এই শহরের নামিদামী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা করেন, গ্রিন ইউনিভার্সিটি। কিছুদিন পর তার বিয়ে হয়ে যাবে। তার জন্য শুভ কামনা। 
প্রিয় ভাই, বিধাতার কাছে শুকরিয়া তিনি আমাকে ধৈর্য শক্তি দান করেছেন, আমি কোনোদিনও তার কাছে অভিযোগ করে বলবো না ‘তুমি এটা দাওনি, ওটা দাওনি। 
শুধু বলবো বিধাতা পৃথিবীতে যা কিছু সৃষ্টি করেছ সবই তো সৃষ্টির কল্যাণে, তবে তোমার দোজখে আমাকে ঠাঁই দাও, আমি দোজখে বসে আমার কল্যাণ গড়তে চাই। 
ছোট্ট জীবনে মানুষের কত্ত কথা! এত্ত কথা না বলে মানুষ যদি বাঁচতে পারতো তবে সাহিত্যের জন্ম না হলেও মানুষ বাঁচতে পারতো। 
গান, কবিতা, গল্প এগুলো আছে বলেই মানুষ পৃথিবীতে বাঁচতে পারে শত আঘাতে। তাই সাহিত্যের বিশেষ ভূমিকা পৃথিবী জুড়ে। 
প্রিয় ভাই, অনেক কথাই বলে ফেলেছি আপনাকে, আমার কোনো কথায় আপনি ব্যথিত হয়ে থাকলে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন, পারলে ক্ষমা করে দিবেন। আর আমার মৃত্যুর পর 
কিছু গোলাপের কাঁটা আমার কবরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে দিয়ে আসবেন, কারণ তখন আমার কবরে ফুল দেয়ার মানুষের অভাব হবে না, 
যতটা অভাব আজ প্রিয় মানুষের কাছ থেকে একটি গোলাপ ফুল পাওয়ার। 
প্রিয় ভাই, এখন রাত আর লিখতে পারছি না। সারাদিন অফিস করে শরীর অনেকটা দুর্বল, সকালে অফিসে যেতে হবে। 
চিঠির সমাপ্তি দিচ্ছি আজ, পরিশেষে সবার মঙ্গল কামনা করি। আপনি ভালো থাকুন সুস্থ থাকুন, হাজার বছর বাঁচুন।

ইতি, 
আপনার ছোট ভাই 
অধম।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

মানুষ ছাড়া মুক্তি নাই

 আত্মাটারে মানুষ বানাই  মানুষ হও মাটির অধম  মানুষ ছাড়া মুক্তি নাই  এই মানব জনম।  মানুষ আকৃতি থাকলে পরে  মানুষ বলে কয় না তারে  ষড়রিপু গুলিরে ...